একসময় ঈদ মানেই ছিল ডাকপিয়নের ব্যাগভর্তি বাহারি ঈদ কার্ড, স্টেশনারি দোকানে কার্ড কেনার ভিড়, আর প্রিয়জনের হাতে পৌঁছানো ভালোবাসায় মোড়ানো শুভেচ্ছাবার্তা। কিন্তু প্রযুক্তির দাপটে আজ সেই ঐতিহ্য প্রায় হারিয়ে যেতে বসেছে।
নব্বইয়ের দশকে ঈদ কার্ডের জনপ্রিয়তা ছিল তুঙ্গে। ঈদের আগমনী আনন্দ শুরু হতো বইয়ের দোকান, স্টেশনারি শপ কিংবা রাস্তার পাশের অস্থায়ী স্টল থেকে রঙিন কার্ড কেনার মধ্য দিয়ে। শিক্ষার্থীরা ঈদের আগে বিশেষভাবে টাকা জমাত কার্ড কেনার জন্য। বন্ধুবান্ধব, আত্মীয়-স্বজন, এমনকি প্রিয় শিক্ষকের জন্যও বেছে বেছে কার্ড কেনার রেওয়াজ ছিল। কার্ডে হাতের লেখায় মিশে থাকত অনুভূতি, কখনও সুন্দর করে আঁকা কোনো নকশা, কখনও বা ভালোবাসার কবিতা।
ঈদ কার্ডের ডিজাইনেও ছিল বৈচিত্র্য। কেউ পছন্দ করত ইসলামিক মোটিফ, যেখানে থাকত মসজিদ, চাঁদ-তারা কিংবা আরবি ক্যালিগ্রাফি। আবার কেউ পছন্দ করত আধুনিক ডিজাইন, যেখানে থাকত ফুল, প্রকৃতি বা কার্টুন চরিত্র। এমনকি জনপ্রিয় সাহিত্যিকদের উদ্ধৃতি সংবলিত কার্ডও ছিল দারুণ চাহিদাসম্পন্ন।
কিন্তু সময় বদলেছে। এখন ঈদের শুভেচ্ছা জানানো হয় ফেসবুক পোস্টে, হোয়াটসঅ্যাপ মেসেজে কিংবা ডিজিটাল ই-কার্ডে। স্মার্টফোন ও ইন্টারনেটের প্রসারের ফলে হাতে লেখা ঈদ কার্ডের জায়গা দখল করেছে ভার্চুয়াল শুভেচ্ছা বার্তা। ডাক ব্যবস্থার পরিবর্তনের কারণে ডাকপিয়নের ব্যাগও হালকা হয়ে গেছে। যে দোকানগুলোতে একসময় রঙিন ঈদ কার্ডের সারি সাজানো থাকত, সেখানেও এখন জায়গা করে নিয়েছে গিফট আইটেম কিংবা ইলেকট্রনিক গ্যাজেট।
যদিও আজকের তরুণ প্রজন্মের কাছে ঈদ কার্ড পাঠানোর অনুভূতি অপরিচিত, তবুও কিছু মানুষ এখনো ঐতিহ্য ধরে রাখার চেষ্টা করেন। কেউ কেউ নিজ উদ্যোগে কার্ড তৈরি করে প্রিয়জনদের পাঠান। কিছু প্রতিষ্ঠান কাস্টমাইজড গ্রিটিংস কার্ড তৈরি করলেও তা বাণিজ্যিকভাবে তেমন জনপ্রিয়তা পায়নি। তবে এ প্রচেষ্টা ঐতিহ্যকে বাঁচিয়ে রাখার ছোট্ট একটি প্রয়াস।
হয়তো হাতে লেখা ঈদ কার্ডের সেই সোনালি দিন আর ফিরে আসবে না, কিন্তু চাইলে ব্যক্তিগত পর্যায়ে এই ঐতিহ্যকে আবারও বাঁচিয়ে তোলা সম্ভব। একটি হাতে লেখা ঈদ কার্ডের উষ্ণতা কি কখনো ডিজিটাল মেসেজে পাওয়া সম্ভব? সময় বদলেছে ঠিকই, কিন্তু কিছু স্মৃতি সবসময় অমূল্যই থেকে যায়।