সিআরবি রক্ষায় আন্দোলনের ডাক

চট্টগ্রামের ফুসফুস বাঁচাতে প্রাণান্তকর আকুতি

প্রকৃতি ও নগরায়ণের দ্বন্দ্বে আধুনিক নগরগুলো যখন ক্রমশ কংক্রিটের জঙ্গলে পরিণত হচ্ছে, তখন বন্দরনগরী চট্টগ্রামের বুকে এক টুকরো সবুজ স্বর্গ হয়ে টিকে আছে সিআরবি (সেন্ট্রাল রেলওয়ে বিল্ডিং) এলাকা। শতবর্ষী বৃক্ষরাজির ছায়াঘেরা আঁকাবাঁকা রাস্তা, পাহাড়ের ঢালে সবুজের সমারোহ এবং প্রাণভরে নিশ্বাস নেওয়ার মতো নির্মল বাতাস— এসব মিলিয়ে সিআরবি কেবল একটি ভৌগোলিক এলাকা নয়, এটি চট্টগ্রামের ‘ফুসফুস’।

এই ‘ফুসফুস’ এলাকায় হাসপাতাল স্থাপনের প্রকল্প ‘পুনরুজ্জীবিত করার উদ্যোগের’ খবরে ফের আন্দোলনের ডাক দিয়েছেন নাগরিক অধিকার কর্মী ও পরিবেশবাদীরা। শনিবার দুই দিনের সফরে চট্টগ্রাম আসছেন সড়ক পরিবহন ও রেল মন্ত্রী শেখ রবিউল আলম। রোববার বিকেল ৪টায় তার সেন্ট্রাল রেলওয়ে বিল্ডিং (সিআরবি) এলাকায় প্রস্তাবিত হাসপাতালের স্থান পরিদর্শনের কথা রয়েছে।

বিষয়টি জানাজানি হওয়ার পর চট্টগ্রামে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে। অনেকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সিআরবি রক্ষার ডাক দিয়েছেন। তাদের যুক্তি, চট্টগ্রামের প্রাণকেন্দ্রে সবুজে ঘেরা ওই জমিতে অবকাঠামো নির্মাণ করতে গেলে গাছপালা কাটা পড়বে এবং অনিন্দ্য সুন্দর ওই পরিবেশ নষ্ট হবে।

এ বিষয়ে করণীয় নির্ধারণে শুক্রবার সন্ধ্যায় বৈঠক করেছে ‘সিআরবি রক্ষা মঞ্চ’। আগামীকাল রোববার সিআরবি এলাকায় মানববন্ধন ও প্রতিবাদ সমাবেশের ডাক দিয়েছে সংগঠনটি।

২০২১ সালের জুলাই মাসে এ প্রকল্পের জমি হাসপাতাল নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠানের কাছে বুঝিয়ে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হলে প্রতিবাদ ও আন্দোলন শুরু হয়। টানা ১৫ মাস ধরে সেই আন্দোলন চলে। সেই আন্দোলনে ‘নাগরিক সমাজ, চট্টগ্রাম’ এবং ‘সিআরবি রক্ষা মঞ্চ’সহ বেশ কিছু সামাজিক সাংস্কৃতিক সংগঠন অংশ নিয়েছিল।

এক পর্যায়ে তখনকর আওয়ামী লীগ সরকারের মন্ত্রী, সংসদ সদস্যসহ স্থানীয় অধিকাংশ রাজনৈতিক দলের নেতা সিআরবিতে হাসপাতাল না করার পক্ষে অবস্থান নেন। টানা ৪৮০ দিন ধরে চলা সেই আন্দোলনের মুখে এক পর্যায়ে আওয়ামী লীগ সরকার সিআরবিতে হাসপাতাল প্রকল্প বাস্তবায়ন না করার ঘোষণা দেয়। ওই আশ্বাসে ২০২২ সালের নভেম্বর মাসে সেই আন্দোলন শেষ হয়।

প্রায় তিন বছর চার মাস পর সিআরবিতে হাসপাতাল প্রকল্পের বিষয়টি আবারও সামনে এল। বাংলাদেশ রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী (ট্র্যাক) মো. মনিরুজ্জামান বলেন, সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বে (পিপিপি) প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য বাংলাদেশ রেলওয়ের সঙ্গে ইউনাইটেড এন্টারপ্রাইজ অ্যান্ড কোম্পানির একটি চুক্তি হয়েছিল। সেটি ৫০ বছরের চুক্তি। সেখানে ৫০০ শয্যার একটি হাসপাতাল এবং ১০০ আসনের একটি মেডিকেল কলেজ করার কথা ছিল। তখন জমি হস্তান্তরের সময় পরিবেশবাদীদের আন্দোলনের কারণে আর তা হয়নি।’

রোববার রেলপথ মন্ত্রী ওই প্রকল্পের স্থানটি পরিদর্শন করবেন জানিয়ে মনিরুজ্জামান বলেন, ‘মন্ত্রী মহোদয় পরিদর্শনে আসবেন, সেটা জানি। তবে প্রকল্পের বিষয়ে বিস্তারিত কিছু জানি না।’ হাসপাতাল প্রকল্পের জন্য চুক্তি হওয়া সেই ইউনাইটেড এন্টারপ্রাইজের সঙ্গে এ বিষয়ে নতুন করে রেলওয়ের কোনো যোগাযোগ হয়নি বলেও জানান তিনি।

এর মধ্যে বৃহস্পতিবার রেলওয়ের পূর্বাঞ্চলের সদর দপ্তর সিআরবি এলাকায় প্রস্তাবিত ওই হাসপাতাল প্রকল্প সংলগ্ন সাত রাস্তার মোড়ে থাকা ২০টি দোকান উচ্ছেদ করা হয়েছে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে পূর্ব রেলের কর্মকর্তা মো. মনিরুজ্জামান বলেন, ‘এটা আমাদের নিয়মিত উচ্ছেদ অভিযানের অংশ।’

রেলওয়ের পূর্বাঞ্চলের সদর দপ্তর-সিআরবি এলাকার ৬ একর জমিতে প্রস্তাবিত হাসপাতালটি নির্মাণের কথা রয়েছে। এ বিষয়ে ইউনাইটেড এন্টারপ্রাইজ অ্যান্ড কোম্পানি লিমিটেডের মহাব্যবস্থাপক (করপোরেট অ্যাফেয়ার্স) কায়েস খলিল খান বলেন, ‘এখন পর্যন্ত নতুন করে কোনো কিছু আমরা ওয়াকিবহাল নই। সেটা সরকারের প্রকল্প, সরকার জানে। সুনির্দিষ্টভাবে এই হাসপাতাল প্রকল্পের বিষয়ে সরকার বা রেলওয়ের সাথে আমাদের এখন পর্যন্ত কথা হয়নি। চুক্তিটি ছিল ৫০ বছরের। আজ পর্যন্ত সরকার আমাদের অফিসিয়ালি বলেনি যে সেখানে হাসপাতাল হবে না।’

কায়েস খলিল খান বলেন, ‘চুক্তির শর্তাদি আমরা পালন করেছি। কিছু ডিপোজিটও সরকারকে তখন দিয়েছিলাম। এছাড়া আমাদের কিছু আনুষাঙ্গিক খরচও হয়েছিল। চুক্তি মতে আমাদের দিক থেকে যেটা করার, সেটা তখন আমরা করেছি।’

এদিকে সিআরবিতে প্রস্তাবিত হাসপাতালের স্থানে রেলমন্ত্রীর পরিদর্শনের সূচি জানাজানি হলে তীব্র প্রতিক্রিয়া হয়। সিআরবি রক্ষা মঞ্চের আহ্বায়ক, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গবেষক ডা. মাহফুজুর রহমান ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে বলেন, ‘জরুরি ভিত্তিতে আমরা মঞ্চের সভায় বসেছি করণীয় ঠিক করতে। সিআরবি দখলের জন্য সেখানে হাসপাতাল প্রকল্প করতে চায় একটি গোষ্ঠী।’

তিনি বলেন, ‘সিআরবিতে ৫০০ শয্যার হাসপাতাল এবং ১০০ আসনের মেডিকেল কলেজ করলে ওই এলাকায় একের পর এক স্থাপনা হবে। ধীরে ধীরে সেখানে রেলওয়ের যত জমি আছে সব ওই প্রকল্পের অধীনে চলে যাবে। চট্টগ্রাম শহরে রেলের অনেক জমি আছে। সিআরবিতেই কেন হাসপাতাল করতে হবে? আমরা আন্দোলনের ডাক দিচ্ছি।’

জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) চট্টগ্রাম মহানগরীর যুগ্ম সমন্বয়কারী আরিফ মঈনুদ্দিন শুক্রবার এক ফেইসবুক পোস্টে লেখেন, ‘সিআরবিতে আমরা হাসিনাকে হাসপাতাল করতে দিই নাই। তারেক রহমান, আপনাকেও দেব না। সিআরবি চট্টগ্রামের ফুসফুস। এখানে হাত দিয়েন না।’

সর্বশেষ