চট্টগ্রামে উদীচীর প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী, শিক্ষার্থীদের সংবর্ধনা

দ্রোহ, প্রতিবাদ আর সাম্যের প্রত্যয়ে উদীচীর ৫৮ বছর

সাম্রাজ্যবাদ, সাম্প্রদায়িকতা ও আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে সাংস্কৃতিক লড়াই অব্যাহত রাখার প্রত্যয় নিয়ে চট্টগ্রামে উদযাপিত হয়েছে বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর ৫৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী। ‘ফিরিয়ে নাও ঘাতক কাঁটা, এবার আমি গোলাপ নিব’ স্লোগানে আলোচনা সভা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, আবৃত্তি এবং এসএসসি উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীদের সম্মাননা প্রদানের মধ্য দিয়ে দিনটি উদযাপন করে সংগঠনটির চট্টগ্রাম জেলা সংসদ।

শনিবার (৩১ অক্টোবর) সন্ধ্যা ৬টায় নগরের মোমিন রোডের চট্টগ্রাম একাডেমি প্রাঙ্গণে এ আয়োজন করা হয়। আলোচনা সভায় সভাপতিত্ব করেন উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী কেন্দ্রীয় সংসদের সহসভাপতি ও চট্টগ্রাম জেলা সংসদের সভাপতি প্রাবন্ধিক জসীম চৌধুরী সবুজ। সঞ্চালনা করেন জেলা সংসদের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট অসীম বিকাশ দাশ।

আলোচনায় অংশ নেন উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী কেন্দ্রীয় সংসদের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি হাবিবুল আলম, চট্টগ্রাম জেলা আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি অ্যাডভোকেট রেজাউল করিম চৌধুরী, চট্টগ্রাম জেলা শিল্পকলা একাডেমির কালচারাল অফিসার আয়াজ মাবুদ এবং উদীচী চট্টগ্রাম জেলা সংসদের সহসভাপতি সুনীল ধরসহ অন্যরা।

বক্তারা বলেন, ১৯৬৮ সালের ৩১ অক্টোবর শিল্পী, সাহিত্যিক ও সংগ্রামী সত্যেন সেন, রণেশ দাশগুপ্ত ও শহীদুল্লাহ কায়সারসহ প্রগতিশীল ব্যক্তিদের নেতৃত্বে মেহনতি মানুষের মুক্তির স্বপ্ন নিয়ে যাত্রা শুরু করে উদীচী। প্রতিষ্ঠার পর থেকে সংগঠনটি শুধু সাংস্কৃতিক চর্চায় সীমাবদ্ধ থাকেনি; শোষিত-নির্যাতিত মানুষের অধিকার ও গণতান্ত্রিক আন্দোলনে প্রতিবাদের শক্তি হিসেবে ভূমিকা রেখেছে। মুক্তিযুদ্ধের অসাম্প্রদায়িক ও বহুত্ববাদী চেতনা ধারণ করে সংগঠনটির সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক সংগ্রাম অব্যাহত রয়েছে।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে হাবিবুল আলম বলেন, সারা পৃথিবী আজ যুদ্ধোন্মাদনা ও সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসনের শিকার। সাম্রাজ্যবাদ ও সাম্প্রদায়িকতার মদদে দেশে দেশে নিরীহ মানুষের রক্ত ঝরছে। বাংলাদেশও নানা ভূরাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের কারণে সংকটের মুখে পড়ছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তথাকথিত কৌশলগত অংশীদারত্বের আড়ালে জনবিরোধী চুক্তি এবং চট্টগ্রাম বন্দর বিদেশিদের হাতে তুলে দেওয়ার অপতৎপরতা দেশের সার্বভৌমত্ব ও অর্থনীতির জন্য উদ্বেগজনক। দেশের সম্পদে জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠায় গণপ্রতিরোধের মাধ্যমে উদীচীর লড়াই অব্যাহত থাকবে।

অ্যাডভোকেট রেজাউল করিম চৌধুরী বলেন, সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসনের পাশাপাশি দেশের অভ্যন্তরীণ সমাজ ও রাজনীতিতে সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্প ছড়িয়ে পড়েছে। মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে প্রতিষ্ঠিত অসাম্প্রদায়িক, বহুত্ববাদী ও ধর্মনিরপেক্ষ বাংলাদেশের চেতনাকে পদদলিত করার অপচেষ্টা চলছে। বিশেষ করে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সাহিত্য, দর্শন ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের ওপর আঘাত বাংলাদেশের অসাম্প্রদায়িক জাতিসত্তার জন্য উদ্বেগজনক। ১৯৬১ সালে পাকিস্তানি শাসকদের নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে রবীন্দ্রসংগীতের পক্ষে বাংলার মানুষের যে সাংস্কৃতিক প্রতিরোধ গড়ে উঠেছিল, তা আমাদের মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সাংস্কৃতিক ভিত্তি। রবীন্দ্রনাথের দর্শন ও সৃষ্টিকে ধারণ করে অন্ধকারের বিরুদ্ধে সাংস্কৃতিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে।

সভাপতির বক্তব্যে জসীম চৌধুরী সবুজ বলেন, উদীচীর পথচলা কখনো সহজ ছিল না। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে সংগঠনটির শিল্পী-কর্মীরা অস্ত্র হাতে লড়াই করেছেন। স্বাধীনতার পর সামরিক শাসন, স্বৈরতন্ত্র ও সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধেও রাজপথে সক্রিয় থেকেছেন। আপসহীন সাংস্কৃতিক আন্দোলনের কারণে উদীচীকে বারবার হামলার শিকার হতে হয়েছে। ১৯৯৯ সালের ৬ মার্চ যশোরে উদীচীর দ্বাদশ জাতীয় সম্মেলনে এবং ২০০৫ সালের ৪ ডিসেম্বর নেত্রকোনায় সংগঠনটির কার্যালয়ে বোমা হামলায় প্রাণ হারান বহু শিল্পী-কর্মী। তবু মুক্তিযুদ্ধের অসাম্প্রদায়িক আদর্শ থেকে উদীচী বিচ্যুত হয়নি, ভবিষ্যতেও হবে না।

তিনি বলেন, প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর এ আয়োজন বৈষম্যহীন, অসাম্প্রদায়িক ও সাম্যবাদী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রামকে আরও শাণিত করার নতুন অঙ্গীকার।

আলোচনা সভা শেষে সংগীত পরিবেশন করে ‘বিশ্বতান’। আবৃত্তি করেন জয়শ্রী মজুমদার। পরে উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী চট্টগ্রাম জেলা সংসদের শিল্পী-কর্মীরা গণসংগীত পরিবেশন করেন। সাংস্কৃতিক পরিবেশনা শেষে এসএসসি উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীদের সম্মাননা দেওয়া হয়।

সর্বশেষ