ইলম, আমল ও তাসাউফের আলোকবর্তিকা হযরত আবদুল কাদির জিলানী (রহ.)

সৈয়দ মোহাম্মদ আসিফ কামাল

ইসলামের ইতিহাসে এমন কিছু মহামানবের আবির্ভাব ঘটেছে, যাঁদের জীবন কেবল একটি ব্যক্তির জীবনী নয়; বরং একটি যুগের ইলম, আমল, আত্মশুদ্ধি ও আধ্যাত্মিক জাগরণের ইতিহাস। তাঁদের অন্যতম হলেন বড় পীর, গাউসুল আজম, মাহবুবে সুবহানী, গাউসে সামদানী, কুতুবে রাব্বানী, মুহিউদ্দীন হযরত শায়খ সাইয়্যিদ আবদুল কাদির জিলানী আল-হাসানী ওয়াল-হুসাইনী (রহ.)। মুসলিম বিশ্বের সুফি ঐতিহ্যে তাঁর নাম গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার সঙ্গে স্মরণ করা হয়। তবে তাঁর প্রকৃত মহত্ত্বের প্রধান ভিত্তি কেবল কারামত বা অলৌকিক ঘটনার বর্ণনা নয়; বরং তাঁর ইলম, তাকওয়া, শরিয়তের প্রতি আনুগত্য, সত্যবাদিতা, আখলাক, দাওয়াত ও আত্মশুদ্ধির শিক্ষা।

প্রচলিত জীবনীগ্রন্থ ও মানাকিবের বর্ণনা অনুযায়ী, তিনি হিজরি ৪৭০ সালের ১ রমজান জিলান অঞ্চলে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা সাইয়্যিদ আবু সালেহ মূসা জঙ্গী (রহ.) এবং মাতা সাইয়্যিদা উম্মুল খায়ের ফাতিমা (রহ.)। পিতৃসূত্রে ইমাম হাসান (রা.) এবং মাতৃসূত্রে ইমাম হুসাইন (রা.)-এর বংশধর হিসেবে তিনি হাসানী-হুসাইনী সাইয়্যিদ হিসেবে প্রসিদ্ধ। তাঁর শৈশব থেকেই পরিবারে ইবাদত, তাকওয়া, সত্যবাদিতা ও দ্বীনি শিক্ষার পরিবেশ ছিল। পরবর্তী জীবনে তাঁর চরিত্রে যে সত্যনিষ্ঠা ও আল্লাহভীতি প্রকাশ পেয়েছে, তার পেছনে এই পারিবারিক শিক্ষার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল।

তরুণ বয়সে তিনি ইসলামী জ্ঞান অর্জনের উদ্দেশ্যে তৎকালীন জ্ঞানচর্চার অন্যতম প্রধান কেন্দ্র বাগদাদে আগমন করেন। সেখানে তিনি ফিকহ, হাদিস, তাফসির, কিরাআত, আরবি ভাষা ও অন্যান্য ইসলামী জ্ঞানশাস্ত্রে অধ্যয়ন করেন। বিশেষভাবে হাম্বলি ফিকহের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক সুপরিচিত হলেও তাঁর শাফেয়ি ফিকহ সম্পর্কেও জ্ঞান ছিল বলে জীবনীগ্রন্থে উল্লেখ পাওয়া যায়। ফলে তাঁকে শুধু একজন সুফি সাধক হিসেবে দেখলে তাঁর ব্যক্তিত্বের পূর্ণ পরিচয় পাওয়া যায় না; তিনি ছিলেন একজন আলেম, ফকিহ, শিক্ষক, ওয়ায়েজ ও আধ্যাত্মিক পথপ্রদর্শক।

ইলমের পাশাপাশি তিনি আত্মশুদ্ধি ও মুজাহাদার পথেও অগ্রসর হন। শায়খ আবু মুহাম্মদ আদ-দাব্বাস (রহ.) এবং শায়খ আবু সাঈদ আল-মুখাররিমী বা মাখযুমী (রহ.)-এর সঙ্গে তাঁর আধ্যাত্মিক সম্পর্কের কথা জীবনীসাহিত্যে পাওয়া যায়। দীর্ঘ সাধনা, ইবাদত, জিকির, আত্মসংযম ও নফসের বিরুদ্ধে সংগ্রামের মধ্য দিয়ে তিনি নিজের অন্তরকে পরিশুদ্ধ করার চেষ্টা করেন। তাঁর তাসাউফের মূল শিক্ষা ছিল আধ্যাত্মিক উন্নতি কখনো শরিয়তের বিকল্প নয়; বরং শরিয়তের যথাযথ অনুসরণই আত্মশুদ্ধির ভিত্তি।

এই দৃষ্টিভঙ্গিই তাঁর শিক্ষার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য। তিনি এমন আধ্যাত্মিকতার শিক্ষা দেননি, যা মানুষকে শরিয়তের বিধান থেকে মুক্ত করে দেয়। বরং তাঁর জীবন ও উপদেশে নামাজ, হালাল-হারাম, সুন্নাহ, তাকওয়া, তওবা ও নৈতিক চরিত্রের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেখা যায়। তাঁর নামে প্রচলিত সেই বিখ্যাত ঘটনার নৈতিক শিক্ষাও এটাই কোনো ব্যক্তি যত উচ্চ আধ্যাত্মিক অবস্থানেই পৌঁছান না কেন, শরিয়তের বিধান তাঁর জন্য অপ্রাসঙ্গিক হয়ে যায় না।

বাগদাদে তাঁর ওয়াজ ও শিক্ষাদানের প্রভাব ছিল ব্যাপক। তাঁর মজলিসে বিভিন্ন শ্রেণির মানুষ সমবেত হতেন। কুরআন, হাদিস, ফিকহ, তাফসির, আখলাক ও আত্মশুদ্ধির সমন্বিত আলোচনার মাধ্যমে তিনি মানুষকে আল্লাহর দিকে ফিরে আসার আহ্বান জানাতেন। তাঁর বক্তব্যের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল তিনি মানুষের বাহ্যিক পরিচয়ের পরিবর্তে অন্তরের সংশোধনের ওপর গুরুত্ব দিতেন। তওবা, ইখলাস, আল্লাহভীতি, সত্যবাদিতা ও নফসের সংশোধন ছিল তাঁর নসিহতের কেন্দ্রীয় বিষয়।

তাঁর জীবন থেকে সত্যবাদিতার যে শিক্ষা পাওয়া যায়, তা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। বাগদাদে যাওয়ার পথে ডাকাতদের সঙ্গে তাঁর চল্লিশটি স্বর্ণমুদ্রার ঘটনা মানাকিব সাহিত্যে অত্যন্ত প্রসিদ্ধ। বর্ণনাটির সনদ ও বিবরণ নিয়ে ঐতিহাসিকভাবে বিভিন্নতা থাকলেও এর নৈতিক শিক্ষা অত্যন্ত গভীর সত্যবাদিতা কখনো ছোট গুণ নয়। একজন মানুষের সত্যনিষ্ঠ চরিত্র অনেক সময় দীর্ঘ বক্তৃতার চেয়েও শক্তিশালী দাওয়াতের ভূমিকা পালন করতে পারে।

হযরত আবদুল কাদির জিলানী (রহ.)-এর সঙ্গে ‘মুহিউদ্দীন’ উপাধিও বিশেষভাবে যুক্ত। পরবর্তী মুসলিম ঐতিহ্যে এই উপাধি তাঁর দ্বীনি জ্ঞান, ওয়াজ, নসিহত, আত্মশুদ্ধি ও মানুষের মধ্যে দ্বীনি চেতনা জাগ্রত করার ভূমিকার সঙ্গে সম্পর্কিত হয়েছে। তাঁর পুনর্জাগরণের মূল ক্ষেত্র ছিল মানুষের অন্তর। তিনি মানুষকে জ্ঞান অর্জন, জ্ঞান অনুযায়ী আমল এবং আমলের মাধ্যমে আত্মশুদ্ধির পথে পরিচালিত করতে চেয়েছেন।

তাঁর প্রতি মানুষের ভালোবাসার আরেকটি কারণ তাঁর সুন্দর আখলাক। জীবনীগ্রন্থগুলোতে তাঁকে বিনয়ী, দয়ালু, উদার, দরিদ্রপ্রেমী ও মানুষের প্রতি কোমল হৃদয়ের অধিকারী হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। তাঁর কাছে ইলমের সৌন্দর্য প্রকাশ পেত চরিত্রে, আর তাসাউফের সৌন্দর্য প্রকাশ পেত মানুষের সঙ্গে আচরণে। তিনি মানুষকে নিজের প্রতি নয়, আল্লাহর প্রতি আকৃষ্ট করার চেষ্টা করেছেন।

জীবনের শেষ পর্বেও তিনি ইলম, ওয়াজ, নসিহত ও মানুষের আত্মশুদ্ধির কাজে নিয়োজিত ছিলেন। তাঁর মজলিসে মানুষ দ্বীনি শিক্ষা ও আত্মিক দিকনির্দেশনা লাভ করত। দীর্ঘ কর্মময় জীবনের পর তিনি বাগদাদে ইন্তেকাল করেন। প্রচলিত ও অধিক পরিচিত মত অনুযায়ী তাঁর ইন্তেকাল ৫৬১ হিজরির ১১ রবিউস সানি, যা আনুমানিক ১১৬৬ খ্রিস্টাব্দের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। তবে তাঁর ইন্তেকালের নির্দিষ্ট তারিখ নিয়ে জীবনীগ্রন্থে কিছু মতভেদ পাওয়া যায়; কোনো কোনো বর্ণনায় ৮, ৯, ১১, ১৩ বা অন্য তারিখও উল্লেখিত হয়েছে। তাঁর বয়স মৃত্যুকালে প্রায় ৯০ বছরের কাছাকাছি ছিল বলে প্রচলিত জীবনীতে উল্লেখ পাওয়া যায়।

ইন্তেকালের পর তাঁকে বাগদাদেই দাফন করা হয়। তাঁর মাজার পরবর্তী শতাব্দীগুলোতে মুসলিম বিশ্বের অন্যতম পরিচিত জিয়ারতস্থানে পরিণত হয়। বিশেষ করে ভারতীয় উপমহাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে তাঁর প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা গড়ে ওঠে। তাঁর নামকে কেন্দ্র করে গিয়ারভী শরীফ বা ফাতেহা-ইয়াজদহমসহ বিভিন্ন ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক স্মরণ-অনুষ্ঠানের প্রচলনও দেখা যায়। এসব পরবর্তী ঐতিহ্যের ঐতিহাসিক বিকাশ আলাদা আলোচনার বিষয় হলেও এতে তাঁর দীর্ঘস্থায়ী আধ্যাত্মিক প্রভাবের পরিচয় পাওয়া যায়।

তাঁর জীবনী ও মানাকিবে অসংখ্য কারামতের বর্ণনা রয়েছে। তবে এসব বর্ণনার ক্ষেত্রে ঐতিহাসিক নির্ভরযোগ্যতার স্তর এক নয়। তাই তাঁর মর্যাদা প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে যাচাইহীন কাহিনির ওপর নির্ভর না করে তাঁর সুপ্রতিষ্ঠিত ইলম, আমল, তাকওয়া, শরিয়তের আনুগত্য, দাওয়াত ও আত্মশুদ্ধির শিক্ষাকে সামনে রাখা অধিক তাৎপর্যপূর্ণ। তাঁর সবচেয়ে বড় প্রভাব ছিল মানুষের জীবনে পরিবর্তন সৃষ্টি করা পাপীকে তওবার দিকে, অজ্ঞকে জ্ঞানের দিকে এবং গাফেল হৃদয়কে আল্লাহর স্মরণের দিকে ফিরিয়ে দেওয়া।

হযরত শায়খ আবদুল কাদির জিলানী (রহ.)-এর জীবন তাই ইলম ও তাসাউফের সমন্বিত এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। তাঁর জীবনের মূল শিক্ষা হলো ইলম ছাড়া আমল পূর্ণতা পায় না, আমল ছাড়া ইলমের সৌন্দর্য প্রকাশ পায় না এবং শরিয়ত ও আত্মশুদ্ধির সমন্বয় ছাড়া আধ্যাত্মিক জীবন পরিপূর্ণ হয় না। তাঁর ইন্তেকালের বহু শতাব্দী পরও তাঁর ইলম, তাকওয়া, সত্যবাদিতা, সুন্দর আখলাক ও আল্লাহমুখী জীবনের শিক্ষা মুসলিম সমাজে আধ্যাত্মিক অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে আছে।

লেখক : শাহজাদা, দরবারে কামালিয়া শরীফ, রাউজান, চট্টগ্রাম।